Wednesday, October 29, 2025

দার্জিলিং ট্যুর ২য় পর্ব

🚗 ৮ই এপ্রিল সকাল ৮ ঘটিকায় আমাদের (আমি ও রাসেল - আমার এক ছোট ভাই) হিলির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা প্রাইভেট কার নিয়ে (আমার কাজিনের)। কারণ আমরা পোর্ট হিসেবে হিলি বেছে নিয়েছিলাম কারণ বগুড়া থেকে সবচেয়ে কাছেই এই পোর্ট। তাছাড়া আমাদের কোনো প্ল্যান ছিল না, হিলি হয়ে বালুরঘাট রেলস্টেশন থেকে উত্তরে দার্জিলিং এ যেতে পারব আবার দক্ষিণে কলকাতার দিকেও যেতে পারব এইজন্য। যাত্রার শুরুতেই ঘটে এক বিপত্তি। সকাল বেলা উঠেই দেখি কারের সামনে চাকার হাওয়া একদম নাই। তারপর এক্সট্রা চাকা লাগাইতে প্রায় ঘণ্টাখানেক দেরি হয়ে যায়। তাই আমাদের হিলি বর্ডারে ও পৌছাইতে প্রায় ১০ টা বেজে যায়।
🇧🇩 হিলি পোর্ট: হিলি পোর্ট নিয়ে কিছু কথা বলি। হিলি পোর্ট এ আপনি কখনোই নিজে নিজে সব কাগজপত্র জমা দিয়ে পার হতে পারবেন না। যদি হতেও পারেন সেটা আপনার সৌভাগ্য, কিন্তু সেটা করতে আপনার সারাদিন লেগেও যেতে পারে। তাই আমরা বাংলাদেশী পার্শ্বে 'রহমান মুন্সি' (১৫০ টাকা) আর ভারতে 'পিন্টু দাদা' (২০০ রূপি) জনপ্রতি হাদিয়া দিয়ে মাত্র ১ ঘণ্টার ও কম সময়ে বাংলাদেশ- ভারত দুই দেশের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস এর সকল কাজ শেষ করে ভারতে প্রবেশ করি। তখন ভারতীয় সময় ১১ টা বাজে। তাই সবাইকে বলবো আপনারা বর্ডারে অবশ্যই সময়মতো পৌঁছাবেন নাহলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলায় পড়তে পারেন। আরেকটা বিষয় সেটা হলো সেদিন রেট ছিল ৭১ টাকা কিন্তু আমার কাজিন এর পরিচিত অন্য আরেকজন দালালের মাধ্যমে মানি এক্সচেঞ্জ করে ৭২ পেয়েছিলাম। টাকা জমা দিয়ে রিসিট নিয়ে ওপারে মাছবাজারে গিয়ে রূপি নিয়েছিলাম। আমাদের একটা ভারতীয় সিম কার্ড নেওয়ার কথা। পিন্টু দাদা বলল এখন সিম কার্ড নিতে চাইলে আপনারা বালুরঘাট রেলস্টেশন এর শিলিগুড়ি যাওয়ার ট্রেনটি মিস করবেন তাই ভালো হবে শিলিগুড়ি যেয়ে সিম টা নেওয়া। উনি আমাদেরকে একটা অটো ভাড়া করে দিলেন (৩০০ রূপি) হিলি থেকে বালুরঘাট রেলস্টেশন পর্যন্ত। হাতে সময় ছিল মাত্র ৭০ মিনিটের মত। ড্রাইভার (গোপাল) খুবই অভিজ্ঞ ছিল। নিজে একজন বাইকার হয়েও গোপালের অটো ড্রাইভিং দেখে আমি মুগ্ধ, আর আল্লাহপাকের রহমতে আমরা শিলিগুড়ি ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস (১২:১৫) কোনোভাবে ধরতে পেরেছিলাম। সে এক জীবনের উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত। ট্রেনটি লোকাল তাই প্ল্যাটফর্মের টিকেট কাউন্টার থেকেই আমাদেরকে টিকেট কাটতে হয়েছিল (জনপ্রতি ১১৫ রূপি)। এই বেপারে অটো ড্রাইভারটা খুবই হেল্প করেছিল কারণ আমরা স্টেশন এর কিছুই চিনতাম না তাছাড়া ট্রেনটি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার জন্য হর্নের অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে আমরা ট্রেনে উঠে অনেক খোঁজাখুঁজি করে জানালার ধরে দুইটা সিট পাই। 

 🚉 শিলিগুড়ি ইন্টার্সিটি এক্সপ্রেস: এখন এই লোকাল ট্রেনটা নিয়ে একটু আলোচনা করি। যারা হিলি হয়ে শিলিগুড়ি - দার্জিলিং - সিকিম যাবেন তারা এই ট্রেন ব্যাবহার করতে পারেন। লোকাল ট্রেন হলেও অনেক ভালই সার্ভিস। রেটিং এ ১০ এ ৭ দিবো আমি। ১১৫ রুপিতে ৩২২ কিঃমিঃ ট্রেন জার্নি আসলেই আমি অনেক উপভোগ করেছিলাম। কারণ বড় হওয়ার পর এটাই আমরা প্রথম ট্রেন জার্নি তাও আবার ভারতে। ট্রেনটি প্রত্যেকদিন ভারতীয় সময় দুপুর ১২:১৫ মিনিটে বালুরঘাট থেকে যাত্রা করে শিলিগুড়ি পৌঁছায় সন্ধ্যা ৭:০০ মিনিটে। আবার শিলিগুড়ি থেকে প্রত্যেকদিন সকল ৮:০৫ মিনিটে যাত্রা করে বালুরঘাট পৌঁছায় বিকাল ৩:১০ মিনিটে। ট্রেনে আমরা খুব বোরিং সময় কাটাচ্ছিলাম ভারতীয় সিম কার্ড না থাকায়। বাধ্য হয়ে পাশের সিট এর এক ভাই এর থেকে ওয়াই ফাই হটস্পট নিয়ে বাসায় আপডেট জানালাম। ভাইটি ডালখোলা রেলস্টেশনে আমাদের আবারো একাকী রেখে নেমে যায়। তারপর শিলিগুড়ি পর্যন্ত আমরা একদম নেটওয়ার্ক এর বাইরে ছিলাম যা গত ১০ বছরে আমার জীবনে ঘটেনি। অবশেষে আমরা শিলিগুড়ি রেলস্টেশন এ পৌঁছলাম রাত ৮ টার সময়। সেদিন আমাদের ট্রেন টি অনেক লেট করেছিল কোনো এক কারণে। প্লাটফর্ম থেকে বের হওয়ার সময় আমাদেরকে টিকেট শো করে তারপর বের হতে হলো। ভাগ্যিস টিকেট টা ফেলে দেয়নি 🙄। তারপর আমরা দুইজন মিলে সিমের দোকান খুজতে লাগলাম। রেলস্টেশন এর পাশেই এক দোকান দেখলাম, কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে ৩০০ রুপির সিম ৫০০ দিয়ে কিনতে হলো বাধ্য হয়ে। তারপর গুগল মামার সাহায্য নিয়ে জাইকা বিরিয়ানি হাউসে আমরা ডিনার করলাম কারণ ট্রেনে আমরা কোনমতে পানি আর ফলমূল দিয়ে ইফতার করেছিলাম। তারপর জাইকা বিরিয়ানি হাউজের বিপরীত পার্শ্বে 'Amulya guest house' এ ৬০০ রুপিতে ১টা রুম নিয়ে নিলাম শুধুমাত্র সেই রাত টা থাকার জন্য। হোটেলে চেক ইন করার সময় আমাদেরকে দুইজনকে পাসপোর্টের ফটোকপি জমা দিতে হয়েছিল যেহেতু আমরা ফরেনার (বাংলাদেশী)।

 🚌 ৯ই এপ্রিল সকল ৭ টায় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হোটেল থেকে চেক আউট করে আমরা কিছু ফলমূল কিনে অটো নিয়ে তেনজিং নুরুগে বাস স্ট্যান্ড এ গেলাম কারণ আমাদের গন্তব্য ছিল পাহাড়ের রাণী (দার্জিলিং)। সেখানে যাওয়ার সময় কত ড্রাইভার আর ট্রাভেল এজেন্ট যে আমাদের মাথা খাবার চেষ্টা করলো কিন্তু আমরা কোনো পাত্তা দিলাম না। ১ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট সহ্য করার পর অবশেষে NBSTC এর কাউন্টার ৪ নং কাউন্টার থেকে দুইটা টিকেট পেলাম (জনপ্রতি ১০৫ রূপি)। সেখানে পরিচিত হলাম ঝাড়খণ্ডের এক সরকারি কর্মকর্তা ' শুভম দাদা ' যার সাথে কাউন্টারে প্রায় আধ ঘণ্টা সময় প্রথমে হিন্দি তারপর ইংলিশে কথা বলে কাটালাম। আমি টিকিটের লাইনে থাকার সময় রাসেল নাস্তা করতে গিয়েছিল আর আমার জন্যও নিয়ে আসলো, বাস এর মধ্যেই আমি নাস্তা সেরে নিলাম। ৮:৩০ এ বাস রওনা দিলো দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি রাস্তায় জার্নির ফিলিংসটা আসলেই উত্তেজনাপূর্ণ যেটা সমতলে পাওয়া অসম্ভব। ভিডিও করতে করতে আমরা প্রায় ২ ঘণ্টা কাটলাম। তারপর যখন কার্সিওং পৌঁছলাম তখন ঠান্ডা হিমেল হাওয়ার পরশ পেতে শুরু করলাম। শুভম দাদা কর্শিওং এ নেমে গেলো, পথিমধ্যে আমাদের বাসটা একটা বিরতি নিলো সেই সময়েই তার সাথে একটা সেলফি নিয়েই নিলাম। তারপর আমরা জ্যাকেট গায়ে দিলাম। আমরা ঘুম রেল স্টেশন এ বাস থেকে নেমে গেলাম। তারপর আমাদের টার্গেট একটা বাজেট হোটেল খুজা। দুইজনেই হিন্দি/ইংলিশ ফ্লুয়েন্ট তাই কষ্ট হলোনা বেশি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়ে গেলাম। ঘুমের ২০০ মিটার এর মধ্যেই (flagship Anu lodge) ৭০০ রুপিতে নিয়ে নিলাম ১ টা রুম। তারপর কিছু সময় রেস্ট নিয়ে ঘুম রেলস্টেশন এর পাশে kangsangma রেস্টুরেন্টে দুপুরের লাঞ্চ সেরে ঘুম রেলস্টেশন ঘুরে, বাতাসিয়া লুপ এ সারাদিন কাটালাম। তারপর একবারে ডিনার সেরে হোটেলে ফিরলাম। পরদিন মানে ১০ই এপ্রিল একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলাম, একটু ক্লান্তও ছিলাম আমরা তাছাড়া এখানে খুব শীত ছিল (১০-১৪ ডিগ্রি) উঠে ব্রেকফাস্ট করে ঘুমের আশেপাশে ঘুম মোনেস্ট্রি এক্সপোর করলাম তারপর গাড়ি খুঁজতেছিলাম পরদিন সকাল বেলা টাইগার হিল যাওয়ার জন্য, কিন্তু সব ড্রাইভার ১২০০-১৫০০ রূপি দাম হাকাচ্ছিল। পরে আমরা জোড়বাংলা মোড় পর্যন্ত পায়ে হেঁটে লোকাল লোকজনের সাথে আলোচনা করলাম তারা বলল আপনারা হেঁটেই যেতে পারবেন যেহেতু আপনারা যুবক। আমরা দুইজন যথেষ্ট ফলমূল খাচ্ছিলাম আর ভাবলাম পরদিন মনে ১১ই এপ্রিল ঈদের দিন ভোরে হেঁটেই যাবো সেই টাইগার হিলে যেখানে সূর্যোদয় আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য হাজার হাজার লোক ভিড় করে গাড়িবহর নিয়ে। সেদিনও আমরা দুপুরে লাঞ্চ করতে গিয়েছিলাম khangsangma রেস্টুরেন্টে। তখন থেকেই হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হলো থামলোই না সন্ধ্যা পর্যন্ত। বাধ্য হয়ে আমরা দুইজন দুইটা ছাতা কিনলাম (৫০০ রূপি) ঘুম স্টেশন এর একটা দোকান থেকে আর ঠান্ডা থেকে বাঁচতে বিখ্যাত খুল্লাদ চা খেলাম (৩০ রূপি)। সন্ধ্যা পর্যন্ত আশেপাশেই ঘুরাঘুরি করলাম শিলাবৃষ্টির মধ্যেই তারপর ডিনার পার্সেল নিয়ে ফিরলাম হোটেলে কারণ পরদিন আমাদেরকে ৭৪০৭ ফুট (ঘুম রেলস্টেশন) থেকে ৮৪০০ (টাইগার হিল) ফুট উপরে হেঁটেই উঠতে হবে। ফিটনেসের চরম পরীক্ষা দিতে হবে তাই রাত ১০ টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পরলাম। 🌙 ১১ই এপ্রিল ঈদুল ফিতরের দিন ভোর ৩ টায় উঠে ফ্রেশ হয়ে গতকালের পার্সেল করা খাবার খেয়ে, ছাতা আর কিছু ফলমূল নিয়ে রওনা দিলাম দুইভাই। অন্ধকার ছিল রাস্তাটা অনেকদূর পর পর ল্যাম্প পোস্ট ছিল।অনেক কষ্ট হয়েছিল, প্রায় দুইবার বিরতি নিয়ে, পানি - ফলমূল খেয়ে আমরা প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট হাঁটার পর ভোর ৪:৫৫ এর দিকে পৌঁছে গেলাম টাইগার হিল সানরাইজ অবজারভেটরিতে। ওখানে পৌঁছানোর পর হাড় কাপানো ঠান্ডা অনুভব করলাম। চেক করে দেখলাম তাপমাত্রা মাত্র ৫-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর বাতাস ছিল বরফশীতল। হাজার হাজার লোক গিয়েছিল কিন্তু আমরা একটু ব্যতিক্রম ছিলাম পায়ে হেঁটে ট্রেকিং 🧗 করে আসা দুই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ভোর ৫ টা ১৭ মিনিটে সূর্যোদয় দেখলাম সে এক অন্য লেভেলের ফিলিংস। সূর্যোদয় দেখে সবাই চলে যাওয়ার পরেও আমরা প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে সময় কাটালাম। টাইগার হিলে একটাই দোকান ছিল নেপালি এক দিদির, সেখানে নুডুলস আর এক কাপ কফি দিয়ে ব্রেকফাস্ট টাও সেরে নিলাম আমরা। এত টাই ঠান্ডা যে পকেট থেকে ফোন বের করে ৫ মিনিটের বেশি ফটো বা ভিডিও করা সম্ভব ছিল না। তারপর আমরা ফেরার সময় অনেক দামাদামি করে শেষমেষ একটা মিনি জিপ ৪০০ রুপিতে ভাড়া নিয়ে হোটেলে ফিরেছিলাম। সেইটার ফুল ভিডিও আমার ইউটিউব চ্যানেলে আছে। আসল কাহিনী ৩য় পর্বে শেষ হবে। সবার ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক 🕺 

 #HAMIM #hamimbd77 #Hili_port #balurghat_railway_station #siliguri_intercity_express #zaika_biriyani_house #amulya_guest_house #nbstc_bus #anu_lodge #batasia_loop #ghum_railway_station #tiger_hill_sunrise_observatory #darjeeling

No comments:

Post a Comment

Hamim

Search This Blog

Powered by Blogger.

Blog Archive

My Professional Journey 🛣️

  My Professional Journey 🛣️